- ডঃ মধুমঙ্গল সিনহা
আগরতলার পুরনো শহরের গলিতে সন্ধ্যা নামে ধীরে, যেন কেউ কালো শাল টেনে দিচ্ছে আস্তে আস্তে।
রামনগর ১ এর ১৭ নম্বর বাড়িতে সেই সন্ধ্যায় হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ শোনা গেল। শব্দটা এত তীক্ষ্ণ ছিল যে পাশের বাড়ির শান্তি দেবনাথ তাঁর তুলসীতলার প্রদীপ রেখে ছুটে এলেন।
দরজা খোলা ছিল।
ভেতরে মেঝেতে বসে হাঁটু জড়িয়ে কাঁদছেন সুবল দেববর্মা। তাঁর হাতে একটা লাল পাঞ্জাবির টুকরো। আর সামনে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে সেই পাঞ্জাবির বাকি অংশ — কাঁচি দিয়ে কাটা, হাত দিয়ে টেনে ছেঁড়া, একেবারে নষ্ট।
"কে করেছে এটা?" শান্তি দেবী জিজ্ঞেস করলেন।
সুবল দেববর্মা মাথা তুললেন। চোখে জল নয় — চোখে আতঙ্ক।
"এই পাঞ্জাবি আমার ছেলে পরবে তার বিয়েতে। কিন্তু এটা নষ্ট হলে..." তিনি থামলেন। গলা কাঁপছে। " পাত্রীর বাবা বলেছিলেন বিয়েতে যেন বর এই পাঞ্জাবিই পরে, নতুবা পাত্রী বিয়েই করবে না। "
শান্তি দেবী বুঝলেন না। এই পাঞ্জাবি ছাড়া পাত্রী বিয়ে করবে না কেন? অন্য পাঞ্জাবি আনলেই তো হয়।
তখনও কেউ জানে না এই ছেঁড়া পাঞ্জাবির পেছনে লুকিয়ে আছে কি রহস্য!
পরদিন সকাল সাতটায় ফোন বাজল।
প্রমথেশ দাশ তখন বাথরুমে। তিনি গান গাইছিলেন — প্রাণভরা বেসুরো রবীন্দ্রসংগীত। এটা তাঁর বদঅভ্যাস। স্ত্রী মিনতি বলেন, "তুমি গাইলে পাশের বাড়ির কুকুর কাঁদে।" প্রমথেশ হাসেন। কুকুর কাঁদুক, গান থামবে না।
প্রমথেশ দাশ আগরতলার একমাত্র বেসরকারি গোয়েন্দা যিনি রাতে ঘুমের মধ্যে কথা বলেন, সকালে বেসুরো গান গান, এবং কাজের সময় হাতে সবসময় একটা খালি কলম রাখেন — লেখার জন্য নয়, ঘোরানোর জন্য। আঙুলে কলম ঘোরাতে ঘোরাতে ভাবেন।
বয়স পঞ্চাশের কাছে। চুল পাকছে। কিন্তু চোখ দুটো তিরিশ বছরের — সব কিছু দেখে, সব কিছু মনে রাখে।
প্রমথেশ বাবুর বিশেষ দক্ষতা হলো তিনি কণ্ঠস্বর শুনলে মানুষের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারেন। কোন্ কান্না আসল, কোনটা নাটক — এটা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।
আবার ভদ্র লোকের মানবিক দুর্বলতা হলো তিনি মিষ্টি দেখলে — বিশেষত আগরতলার রসগোল্লা — নিজেকে সামলাতে পারেন না। তদন্তের মাঝখানে রসগোল্লা খেতে বসে গেছেন, এমন নজির আছে বহুবার।
তিনি কখনো সরাসরি প্রশ্ন করেন না। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে, অন্য প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে, এমনভাবে কথা বলেন যে সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিজেই সত্য বলে ফেলেন।
ফোনটা তুললেন। সুবল দেববর্মার কণ্ঠস্বর। ভাঙা, ক্লান্ত।
প্রমথেশ শুনলেন। কলম ঘোরাতে লাগলেন।
"আসছি," বললেন।
ঘটনাস্থল ১৭ নম্বর বাড়িতে পৌঁছে প্রমথেশ প্রথমে বাড়িটা দেখলেন — বাইরে থেকে। পুরনো বাড়ি। দেয়ালে শ্যাওলা। কিন্তু দরজার সামনে সদ্য আলপনা আঁকা — বিয়ের প্রস্তুতি।
ভেতরে ঢুকে নমস্কার করলেন।
সুবল দেববর্মা বসে আছেন। পাশে তাঁর স্ত্রী গীতা দেববর্মা — চোখ লাল, ঘুম নেই। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁদের ছেলে অনুপম — যার বিয়ে আগামী পরশু। মুখ শক্ত, কোনো অনুভূতির প্রকাশ নেই।
মেঝেতে ছেঁড়া পাঞ্জাবির টুকরোগুলো এখনও সেভাবেই আছে।
প্রমথেশ বসলেন। কলম বের করলেন। ঘোরাতে লাগলেন।
"সুন্দর বাড়ি," বললেন। "আলপনা কে দিয়েছেন?"
গীতা দেবী বললেন, "আমি আর পাশের বাড়ির রঞ্জিতা মিলে।"
"হুম।" প্রমথেশ উঠলেন। পাঞ্জাবির কাছে গেলেন। হাঁটু গেড়ে বসলেন।
ছেঁড়া অংশগুলো পরীক্ষা করলেন। কাঁচির কাটা — সরল, নিখুঁত রেখা। কিন্তু তারপর হাত দিয়ে টানা হয়েছে — কাপড় ছিঁড়ে গেছে এলোমেলোভাবে।
কেউ আগে কাঁচি দিয়ে কেটেছে, তারপর টেনে ছিঁড়েছে। এটা রাগের কাজ নয় — পরিকল্পনার কাজ।
"পাঞ্জাবিটা কোথায় ছিল?" জিজ্ঞেস করলেন।
"আমার শোবার ঘরের আলমারিতে," সুবল বললেন। "দরজায় তালা ছিল।"
"তালা কোথায়?"
তালাটা আনা হলো। প্রমথেশ দেখলেন — তালা অক্ষত। কিন্তু চাবির গর্তে সামান্য আঁচড়ের দাগ।
পিকিং। কেউ তালা খুলেছে চাবি ছাড়াই। অথচ চিহ্ন প্রায় নেই — দক্ষ হাত।
"বাড়িতে কে কে ছিলেন গতকাল?"
সুবল বললেন তিনটি নাম।
এক: রঞ্জিতা সাহা। পাশের বাড়ির মহিলা। বিকেলে এসেছিলেন আলপনার কাজে।
দুই: দীপক দেব। সুবলের ভাগিনেয়। বিয়ের কাজকর্মে সাহায্য করতে এসেছেন দুইদিন হলো।
তিন: পবিত্র দাশগুপ্ত। অনুপমের বন্ধু। এসেছিল অনুপমের সাথে দেখা করতে।
প্রমথেশ তিনজনকে ডাকলেন।
রঞ্জিতা সাহা — মধ্যবয়সী, বাচাল, সবসময় কথা বলছেন। ঘটনার সময়ে তিনি নাকি রান্নাঘরে ছিলেন গীতা দেবীর সাথে।
আচরণ: অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছেন। বারবার বলছেন, "এত সুন্দর পাঞ্জাবি! কে এমন করল! ভগবান জানেন!"
কিন্তু প্রমথেশ লক্ষ করলেন — তিনি পাঞ্জাবির দিকে তাকাচ্ছেন না। একবারও না।
দীপক দেব — পঁচিশ বছর, চটপটে ছেলে। ব্যবসা করেন আগরতলায়। বললেন তিনি বিকেলেই বাজারে গিয়েছিলেন।
আচরণ: শান্ত। একটু বেশিই শান্ত। প্রমথেশ জিজ্ঞেস করলেন কী কিনেছেন বাজারে। তিনি বললেন, "মাছ।" তারপর একটু থেমে বললেন, "আর সবজি।"
থামাটা প্রমথেশের কানে লাগল।
পবিত্র দাশগুপ্ত — অনুপমের বন্ধু। উচ্চশিক্ষিত। দিল্লি পড়াশোনা করে সম্প্রতি ফিরেছেন। বললেন তিনি এসেছিলেন মাত্র আধঘণ্টা আগে।
আচরণ: চোখ এড়ায়। অনুপমের দিকে একটু বেশিই তাকাচ্ছেন — যেন মাপছেন।
প্রমথেশ কলম ঘোরালেন।
বাইরে বেরিয়ে প্রমথেশ প্রতিবেশীদের সাথে কথা বললেন।
একজন বৃদ্ধ জানালেন গতকাল সন্ধ্যায় বাড়ির পাশ দিয়ে একজন অচেনা লোককে যেতে দেখেছেন — কালো জামা, মাথায় টুপি।
প্রমথেশ নোট করলেন। কিন্তু মনের কোণে একটা প্রশ্ন জেগে রইল — সন্ধ্যার আঁধারে কালো জামার লোককে দেখলে কীভাবে জামার রঙ বুঝলেন?
এরপর প্রমথেশ তালার কাছে আবার গেলেন। সাথে ছিল ছোট ম্যাগনিফাইং গ্লাস — তাঁর পুরনো অভ্যাস।
তালার পাশে মেঝেতে একটা ছোট লাল সুতো। পাঞ্জাবির কাপড়ের সুতো।
কেউ তালার সামনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবিটার এই দুর্গতি করেছে? না, সেটা ঠিক নয় । পাঞ্জাবি নষ্ট করা হয়েছে অন্যত্র।
তাহলে সুতোটা কীভাবে এল?
কাকতাল? হয়তো।
কিন্তু প্রমথেশ কাকতালকে বিশ্বাস করেন না।
বেলা বাড়ছে। ঘড়িতে দশটা।
পাত্রীর বাবা শশাঙ্ক রায় ফোন করলেন সুবলবাবুকে। প্রমথেশ পাশে বসেই শুনলেন।
"সুবলদা, আমি শুনেছি পাঞ্জাবির ঘটনাটা। আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম লাল পাঞ্জাবিটা রিয়ার ঠাকুরদার দেওয়া —বাক্য দানের স্মৃতি, সেটা পড়েই বিয়ের কাজ সুসম্পন্ন হবে। সেটা নষ্ট হওয়া মানে এই বিয়েতে কারো সম্মতি নেই। আমার মেয়ে তো একদম সোজা বলছে সে বিয়েই করবে না। অন্ততঃ যদি না জানা যায় কে এবং কেন করেছে এই কাজটা করেছে। আজ রাত দশটার মধ্যে আপনি আমাকে জানান।"
ফোন রাখলেন শশাঙ্ক রায়।
প্রমথেশ বুঝলেন — এটা শুধু পাঞ্জাবির ব্যাপার নয়। এটা বিশ্বাসের পরীক্ষা বটে। বিয়ের আগে কে অশুভ শক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই পরিবারের বিরুদ্ধে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
প্রমথেশ উঠলেন। "রসগোল্লা পাব কোথায়?"
গীতা দেবী অবাক হলেন। "এখন?"
"হ্যাঁ। ভাবার জন্য মিষ্টি দরকার।"
রসগোল্লা খেতে খেতে প্রমথেশ তিনটে জিনিস ভাবলেন।
প্রথমত: তালা পিকিং করা হয়েছে। এটা সাধারণ মানুষের কাজ নয়। হয় পেশাদার চোর, নয়তো এমন কেউ যে বিশেষ কৌশল শিখেছে।
দ্বিতীয়ত: পাঞ্জাবি নষ্ট করা হয়েছে —এটা চুরি নয়। বিয়ে ভেঙে দেওয়ার মতলব।
তৃতীয়ত: পাত্রীর বাবা শশাঙ্ক রায় এত দ্রুত এই ঘটনা জানলেন কীভাবে? ঘটনা ঘটেছে গত সন্ধ্যায়, সকালে ফোন করলেন তিনি। কে জানাল তাঁকে?
এটাই অদৃশ্য সূত্রই হয়তো — তথ্যের গতিপথ।
প্রমথেশ অনুপমের কাছে গেলেন। ছেলেটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
"অনুপম, তোমার বাবার আলমারির চাবি কার কাছে থাকে?"
"বাবার কাছে।"
"কপি আছে?"
একটু থামল অনুপম। "একটা কপি মায়ের কাছে।"
"আর?"
আবার থামল। "আমার কাছেও একটা আছে। জরুরি কাজে যদি লাগে।"
"সেটা কোথায়?"
"আমার ঘরে।"
"দেখাও।"
অনুপম গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এল। মুখ ফ্যাকাশে।
"চাবিটা নেই।"
এক এক করে দুটো তালা খোলে একজন লোক সমস্ত ঘটনা ঘটালো, অথচ বাড়ির কেউ দেখলেন না কেমন অবাক লাগছে।
প্রমথেশ অনুপমের ঘর পরীক্ষা করলেন।
চাবি নেই। কিন্তু চাবি রাখার জায়গাটা — একটা পুরনো টিনের বাক্স — খোলা। ভেতরে ধুলোর দাগ বলছে চাবিটা এতদিন ধরে এখানেই ছিল।
প্রমথেশ পবিত্রের কথা মনে করলেন। অনুপমের বন্ধু। আধঘণ্টা ছিল।
কিন্তু আধঘণ্টায় অনুপমের ঘরে যাওয়া, চাবি চুরি করা, তারপর আলমারি খুলে পাঞ্জাবি বের করে নষ্ট করা — এতকিছু সম্ভব?
সম্ভব। যদি আগে থেকে পরিকল্পনা থাকে।
কিন্তু পবিত্রের মোটিভ কী?
প্রমথেশ জিজ্ঞেস করলেন অনুপমকে — "পবিত্রের সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন?"
অনুপম বলল, "ভালো। মানে... ভালোই ছিল।"
"ছিল?"
অনুপম একটু চুপ করে বলল, "পরীক্ষায় আমি ওর থেকে ভালো করেছিলাম। তারপর থেকে একটু দূরত্ব।"
"আর?"
দীর্ঘ বিরতি।
"ও... ও রিয়াকে পছন্দ করত।"
"রিয়া মানে তোমার হবু বউ?"
অনুপম মাথা নাড়ল।
প্রমথেশের কলম থামল।
পবিত্র চাবি চুরি করতে পারে। কিন্তু পবিত্র কি তালা পিকিং জানে? তাহলে চাবি চুরির দরকার কী?
দুটো পদ্ধতি একই অপরাধে ব্যবহার করা হয়নি।
হয় চাবি, নয় পিকিং।
তাহলে কি দুজন আছে?
দুপুরবেলা প্রমথেশ একটা কাজ করলেন যা তাঁর বিশেষত্ব।
তিনি পুলিশের পুরনো বন্ধু সুজিত চক্রবর্তীকে ফোন করলেন।
"সুজিত, আগরতলায় তালা পিকিং — কারা পারে?"
সুজিত বললেন, "পেশাদার হলে দুই-তিনটে গ্যাং আছে। কিন্তু শখের লোক? সে ইউটিউব দেখে শিখেছে।"
"ইউটিউব?"
"হ্যাঁ। আজকাল অনেকেই শেখে। লকস্মিথিং হবি হিসেবে।"
প্রমথেশ থামলেন। কলম ঘুরল দ্রুত।
শখ।
দীপক দেব — সুবলের ভাগিনেয়। চটপটে ছেলে, ব্যবসায়ী। আচরণে অতিরিক্ত শান্ত।
প্রমথেশ দীপকের ঘরে গেলেন। দীপক নেই — বাজারে গেছে বলেছিল।
ঘরে একটা ব্যাগ। সাধারণ কাপড়ের ব্যাগ।
প্রমথেশ ব্যাগ খুললেন না। শুধু বাইরে থেকে অনুভব করলেন।
শক্ত কিছু আছে ভেতরে।
একটু পরে দীপক ফিরল। প্রমথেশকে দেখে একটু চমকাল।
"কী খুঁজছেন?"
"কিছু না। তোমার ব্যাগটা নিজেই দেখাবে?"
দীপক একটু ইতস্তত করল। তারপর খুলল।
ভেতরে ছোট একটি মেটাল কিট — লকপিক সেট।
প্রমথেশ হাসলেন। "শখ?"
দীপক ঢোক গিলল। "শুধু... শুধু শখ। আমি কিছু করিনি।"
"আমি বলিনি তুমি করেছ," প্রমথেশ শান্তভাবে বললেন। "কিন্তু তোমার এই শখের কথা কে জানে?"
দীপক থামল।
তারপর বলল, "পবিত্র জানে।"
সব টুকরো জুড়তে শুরু করেছেন প্রমথেশ।
কিন্তু এখনো একটা প্রশ্নের উত্তর নেই।
কেন? পবিত্র হয়তো ঈর্ষান্বিত — রিয়াকে পছন্দ করত, পরীক্ষাতেও হেরেছে।জীবন সঙ্গিনীর অর্জনেও সে ব্যর্থতার মুখোমুখি। কিন্তু শুধু পাঞ্জাবি নষ্ট করলে বিয়ে ভাঙবে এটা সে কীভাবে জানল?
প্রমথেশ রঞ্জিতা সাহার কাছে গেলেন।
মহিলা চা বানাচ্ছিলেন। প্রমথেশকে দেখে হাসলেন।
"বসুন গোয়েন্দাবাবু।"
প্রমথেশ বসলেন। কলম বের করলেন।
"পাঞ্জাবিটার কথা আপনি শশাঙ্কবাবুকে জানিয়েছিলেন?"
রঞ্জিতার হাত একটু কাঁপল।
"আমি? না তো।"
"সন্ধ্যায় ঘটনা। সকালে শশাঙ্কবাবুর ফোন। গীতা দেবী জানাননি — তিনি তখন কাঁদছিলেন। সুবলবাবু তখন হতভম্ব। অনুপম ফোন করেনি, আমি দেখেছি। তাহলে কে জানাল?"
রঞ্জিতা চুপ।
"পাঞ্জাবির দিকে আপনি একবারও তাকাননি — কারণ আপনি জানতেন ওটা কেমন বীভৎস দেখাচ্ছে।"
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর রঞ্জিতা বললেন, ধীরে, "পবিত্র আমার ধর্মের ভাইপো।"
সব বেরিয়ে এল।
পবিত্র দাশগুপ্ত রঞ্জিতার ভাইপো — এটা কেউ জানত না, সে কখনো তাদের বাড়িতে আসার সুযোগ পায়নি ।
দিল্লিতে যাবার পূর্বে পবিত্র রিয়াকে পছন্দ করত। রিয়ার বাবা শশাঙ্ক একসময় পবিত্রকেই পাত্র হিসেবে ভেবেছিলেন, কিন্তু অনুপমের সরকারি চাকরির খবর পেয়ে মত পরিবর্তন করেন।
পবিত্রের ক্ষোভ ছিল — নিজের যোগ্যতা নিয়ে এবং রিয়ার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে।
রঞ্জিতা পরিবারের কাছের মানুষ হওয়ার সুযোগে জেনেছিলেন পাঞ্জাবির গল্প — যে ঠাকুরদার দেওয়া পাঞ্জাবি পরে বিয়েতে না গেলে শশাঙ্ক মেয়ের বিয়ে দেবেন না, কারণ রিয়ার ঠাকুরদা নিজেই এই শর্ত দিয়ে ছিলেন একমাত্র নাতনি রিয়াকে।
পাঞ্জাবি নষ্ট করলে বিয়ে ভাঙবে। বিয়ে ভাঙলে পবিত্র হয়তো রিয়াকে ফিরে পাবে।
রঞ্জিতা ভেতর থেকে সাহায্য করেছেন — আলপনার নাম করে এসে অনুপমের ঘর থেকে চাবি সরিয়েছেন। পবিত্র সন্ধ্যায় এসে দীপকের লকপিক ব্যবহারের গল্প বলে নিজেকে সন্দেহের বাইরে রেখেছিল — কিন্তু আসলে চাবি দিয়েই কাজ করেছে। লকপিকের আঁচড়ের দাগ সে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করেছিল দীপককে ফাঁসাতে।
সাধারণ বন্ধু। আধঘণ্টার ভিজিট আর এতো বড়ো ঘটনা এখানে।
বিকেল চারটে।
প্রমথেশ সকলকে এক ঘরে ডাকলেন।
সুবল, গীতা, অনুপম, দীপক, রঞ্জিতা।
পবিত্রকে ফোন করে ডাকা হয়েছে।
প্রমথেশ বললেন, শান্তভাবে, "কাঁচি দিয়ে কাটা মানে সময় নিয়ে কাজ। টেনে ছেঁড়া মানে রাগ বা আবেগ। কিন্তু এই দুটো একসাথে মানে — পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু মনে একটা দ্বন্দ্বও ছিল।"
তিনি রঞ্জিতার দিকে তাকালেন।
"আপনি যখন পাঞ্জাবি কাটছিলেন, হাত একটু কেঁপেছিল। তাই কাঁচির কাট অসম। আর যখন টেনে ছিঁড়েছেন — সেটা রাগে নয়, তাড়াতাড়িতে।"
রঞ্জিতার মুখ সাদা।
প্রমথেশ পবিত্রের দিকে ফিরলেন।
"তুমি রিয়াকে ভালোবাসতে। সেটা অপরাধ নয়। কিন্তু তুমি ভুলে গিয়েছিলে — প্রেম পাওয়া যায় না ষড়যন্ত্র করে।"
পবিত্র মাথা নামিয়ে নিল।
রাত আটটায় শশাঙ্ক রায়কে জানানো হলো সব ঘটনা।
তিনি চুপ করে শুনলেন। তারপর বললেন, "কাল বিয়ে হবে।"
অনুপম নতুন লাল পাঞ্জাবি পরবে — বাজার থেকে আনা হবে আবার। ঠাকুরদার দেওয়া পাঞ্জাবি না থাকলেও তার আশীর্বাদ আবশ্যই নাতনির জন্য ঠাকবে।
প্রমথেশ বাইরে বেরিয়ে এলেন।
রাস্তায় আগরতলার সন্ধ্যা। দূরে মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে। শীতের হাওয়ায় ধূপের গন্ধ।
মিনতি ফোন করলেন — "কখন আসবে তুমি? কবে সেই সকালে বেড়িয়ে গেছ!"
"আসছি। কয়টা রসগোল্লা কিনেই আসছি।"
"আবার?"
"ভাবার কাজ শেষ। এখন খাওয়ার পালা।"
প্রমথেশ দাশ কলমটা পকেটে রাখলেন।
এবার মনে মনে ভাবছেন কাটা পাঞ্জাবিটা শুধু একটা সাক্ষী মাত্র। অপরাধ থাকে মানুষের বুকের ভেতরে, সেই জায়গায় যেখানে ভালোবাসা আর হতাশা পাশাপাশি বাস করে।
একটা পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলা যায়,কাটা যায়; কিন্তু ‘সত্য ‘— সেটা কাঁচি দিয়ে কাটা যায় না, ছিঁড়ে ফেলা যায় না কোন ভাবেই। তাই বুঝি বলা হয়, ‘সত্যমেব জয়তে’।
রামনগর ১ এর ১৭ নম্বর বাড়িতে সেই সন্ধ্যায় হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ শোনা গেল। শব্দটা এত তীক্ষ্ণ ছিল যে পাশের বাড়ির শান্তি দেবনাথ তাঁর তুলসীতলার প্রদীপ রেখে ছুটে এলেন।
দরজা খোলা ছিল।
ভেতরে মেঝেতে বসে হাঁটু জড়িয়ে কাঁদছেন সুবল দেববর্মা। তাঁর হাতে একটা লাল পাঞ্জাবির টুকরো। আর সামনে মেঝেতে ছড়িয়ে আছে সেই পাঞ্জাবির বাকি অংশ — কাঁচি দিয়ে কাটা, হাত দিয়ে টেনে ছেঁড়া, একেবারে নষ্ট।
"কে করেছে এটা?" শান্তি দেবী জিজ্ঞেস করলেন।
সুবল দেববর্মা মাথা তুললেন। চোখে জল নয় — চোখে আতঙ্ক।
"এই পাঞ্জাবি আমার ছেলে পরবে তার বিয়েতে। কিন্তু এটা নষ্ট হলে..." তিনি থামলেন। গলা কাঁপছে। " পাত্রীর বাবা বলেছিলেন বিয়েতে যেন বর এই পাঞ্জাবিই পরে, নতুবা পাত্রী বিয়েই করবে না। "
শান্তি দেবী বুঝলেন না। এই পাঞ্জাবি ছাড়া পাত্রী বিয়ে করবে না কেন? অন্য পাঞ্জাবি আনলেই তো হয়।
তখনও কেউ জানে না এই ছেঁড়া পাঞ্জাবির পেছনে লুকিয়ে আছে কি রহস্য!
পরদিন সকাল সাতটায় ফোন বাজল।
প্রমথেশ দাশ তখন বাথরুমে। তিনি গান গাইছিলেন — প্রাণভরা বেসুরো রবীন্দ্রসংগীত। এটা তাঁর বদঅভ্যাস। স্ত্রী মিনতি বলেন, "তুমি গাইলে পাশের বাড়ির কুকুর কাঁদে।" প্রমথেশ হাসেন। কুকুর কাঁদুক, গান থামবে না।
প্রমথেশ দাশ আগরতলার একমাত্র বেসরকারি গোয়েন্দা যিনি রাতে ঘুমের মধ্যে কথা বলেন, সকালে বেসুরো গান গান, এবং কাজের সময় হাতে সবসময় একটা খালি কলম রাখেন — লেখার জন্য নয়, ঘোরানোর জন্য। আঙুলে কলম ঘোরাতে ঘোরাতে ভাবেন।
বয়স পঞ্চাশের কাছে। চুল পাকছে। কিন্তু চোখ দুটো তিরিশ বছরের — সব কিছু দেখে, সব কিছু মনে রাখে।
প্রমথেশ বাবুর বিশেষ দক্ষতা হলো তিনি কণ্ঠস্বর শুনলে মানুষের মানসিক অবস্থা বুঝতে পারেন। কোন্ কান্না আসল, কোনটা নাটক — এটা তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।
আবার ভদ্র লোকের মানবিক দুর্বলতা হলো তিনি মিষ্টি দেখলে — বিশেষত আগরতলার রসগোল্লা — নিজেকে সামলাতে পারেন না। তদন্তের মাঝখানে রসগোল্লা খেতে বসে গেছেন, এমন নজির আছে বহুবার।
তিনি কখনো সরাসরি প্রশ্ন করেন না। ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে, অন্য প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে, এমনভাবে কথা বলেন যে সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিজেই সত্য বলে ফেলেন।
ফোনটা তুললেন। সুবল দেববর্মার কণ্ঠস্বর। ভাঙা, ক্লান্ত।
প্রমথেশ শুনলেন। কলম ঘোরাতে লাগলেন।
"আসছি," বললেন।
ঘটনাস্থল ১৭ নম্বর বাড়িতে পৌঁছে প্রমথেশ প্রথমে বাড়িটা দেখলেন — বাইরে থেকে। পুরনো বাড়ি। দেয়ালে শ্যাওলা। কিন্তু দরজার সামনে সদ্য আলপনা আঁকা — বিয়ের প্রস্তুতি।
ভেতরে ঢুকে নমস্কার করলেন।
সুবল দেববর্মা বসে আছেন। পাশে তাঁর স্ত্রী গীতা দেববর্মা — চোখ লাল, ঘুম নেই। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁদের ছেলে অনুপম — যার বিয়ে আগামী পরশু। মুখ শক্ত, কোনো অনুভূতির প্রকাশ নেই।
মেঝেতে ছেঁড়া পাঞ্জাবির টুকরোগুলো এখনও সেভাবেই আছে।
প্রমথেশ বসলেন। কলম বের করলেন। ঘোরাতে লাগলেন।
"সুন্দর বাড়ি," বললেন। "আলপনা কে দিয়েছেন?"
গীতা দেবী বললেন, "আমি আর পাশের বাড়ির রঞ্জিতা মিলে।"
"হুম।" প্রমথেশ উঠলেন। পাঞ্জাবির কাছে গেলেন। হাঁটু গেড়ে বসলেন।
ছেঁড়া অংশগুলো পরীক্ষা করলেন। কাঁচির কাটা — সরল, নিখুঁত রেখা। কিন্তু তারপর হাত দিয়ে টানা হয়েছে — কাপড় ছিঁড়ে গেছে এলোমেলোভাবে।
কেউ আগে কাঁচি দিয়ে কেটেছে, তারপর টেনে ছিঁড়েছে। এটা রাগের কাজ নয় — পরিকল্পনার কাজ।
"পাঞ্জাবিটা কোথায় ছিল?" জিজ্ঞেস করলেন।
"আমার শোবার ঘরের আলমারিতে," সুবল বললেন। "দরজায় তালা ছিল।"
"তালা কোথায়?"
তালাটা আনা হলো। প্রমথেশ দেখলেন — তালা অক্ষত। কিন্তু চাবির গর্তে সামান্য আঁচড়ের দাগ।
পিকিং। কেউ তালা খুলেছে চাবি ছাড়াই। অথচ চিহ্ন প্রায় নেই — দক্ষ হাত।
"বাড়িতে কে কে ছিলেন গতকাল?"
সুবল বললেন তিনটি নাম।
এক: রঞ্জিতা সাহা। পাশের বাড়ির মহিলা। বিকেলে এসেছিলেন আলপনার কাজে।
দুই: দীপক দেব। সুবলের ভাগিনেয়। বিয়ের কাজকর্মে সাহায্য করতে এসেছেন দুইদিন হলো।
তিন: পবিত্র দাশগুপ্ত। অনুপমের বন্ধু। এসেছিল অনুপমের সাথে দেখা করতে।
প্রমথেশ তিনজনকে ডাকলেন।
রঞ্জিতা সাহা — মধ্যবয়সী, বাচাল, সবসময় কথা বলছেন। ঘটনার সময়ে তিনি নাকি রান্নাঘরে ছিলেন গীতা দেবীর সাথে।
আচরণ: অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছেন। বারবার বলছেন, "এত সুন্দর পাঞ্জাবি! কে এমন করল! ভগবান জানেন!"
কিন্তু প্রমথেশ লক্ষ করলেন — তিনি পাঞ্জাবির দিকে তাকাচ্ছেন না। একবারও না।
দীপক দেব — পঁচিশ বছর, চটপটে ছেলে। ব্যবসা করেন আগরতলায়। বললেন তিনি বিকেলেই বাজারে গিয়েছিলেন।
আচরণ: শান্ত। একটু বেশিই শান্ত। প্রমথেশ জিজ্ঞেস করলেন কী কিনেছেন বাজারে। তিনি বললেন, "মাছ।" তারপর একটু থেমে বললেন, "আর সবজি।"
থামাটা প্রমথেশের কানে লাগল।
পবিত্র দাশগুপ্ত — অনুপমের বন্ধু। উচ্চশিক্ষিত। দিল্লি পড়াশোনা করে সম্প্রতি ফিরেছেন। বললেন তিনি এসেছিলেন মাত্র আধঘণ্টা আগে।
আচরণ: চোখ এড়ায়। অনুপমের দিকে একটু বেশিই তাকাচ্ছেন — যেন মাপছেন।
প্রমথেশ কলম ঘোরালেন।
বাইরে বেরিয়ে প্রমথেশ প্রতিবেশীদের সাথে কথা বললেন।
একজন বৃদ্ধ জানালেন গতকাল সন্ধ্যায় বাড়ির পাশ দিয়ে একজন অচেনা লোককে যেতে দেখেছেন — কালো জামা, মাথায় টুপি।
প্রমথেশ নোট করলেন। কিন্তু মনের কোণে একটা প্রশ্ন জেগে রইল — সন্ধ্যার আঁধারে কালো জামার লোককে দেখলে কীভাবে জামার রঙ বুঝলেন?
এরপর প্রমথেশ তালার কাছে আবার গেলেন। সাথে ছিল ছোট ম্যাগনিফাইং গ্লাস — তাঁর পুরনো অভ্যাস।
তালার পাশে মেঝেতে একটা ছোট লাল সুতো। পাঞ্জাবির কাপড়ের সুতো।
কেউ তালার সামনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবিটার এই দুর্গতি করেছে? না, সেটা ঠিক নয় । পাঞ্জাবি নষ্ট করা হয়েছে অন্যত্র।
তাহলে সুতোটা কীভাবে এল?
কাকতাল? হয়তো।
কিন্তু প্রমথেশ কাকতালকে বিশ্বাস করেন না।
বেলা বাড়ছে। ঘড়িতে দশটা।
পাত্রীর বাবা শশাঙ্ক রায় ফোন করলেন সুবলবাবুকে। প্রমথেশ পাশে বসেই শুনলেন।
"সুবলদা, আমি শুনেছি পাঞ্জাবির ঘটনাটা। আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম লাল পাঞ্জাবিটা রিয়ার ঠাকুরদার দেওয়া —বাক্য দানের স্মৃতি, সেটা পড়েই বিয়ের কাজ সুসম্পন্ন হবে। সেটা নষ্ট হওয়া মানে এই বিয়েতে কারো সম্মতি নেই। আমার মেয়ে তো একদম সোজা বলছে সে বিয়েই করবে না। অন্ততঃ যদি না জানা যায় কে এবং কেন করেছে এই কাজটা করেছে। আজ রাত দশটার মধ্যে আপনি আমাকে জানান।"
ফোন রাখলেন শশাঙ্ক রায়।
প্রমথেশ বুঝলেন — এটা শুধু পাঞ্জাবির ব্যাপার নয়। এটা বিশ্বাসের পরীক্ষা বটে। বিয়ের আগে কে অশুভ শক্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই পরিবারের বিরুদ্ধে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।
প্রমথেশ উঠলেন। "রসগোল্লা পাব কোথায়?"
গীতা দেবী অবাক হলেন। "এখন?"
"হ্যাঁ। ভাবার জন্য মিষ্টি দরকার।"
রসগোল্লা খেতে খেতে প্রমথেশ তিনটে জিনিস ভাবলেন।
প্রথমত: তালা পিকিং করা হয়েছে। এটা সাধারণ মানুষের কাজ নয়। হয় পেশাদার চোর, নয়তো এমন কেউ যে বিশেষ কৌশল শিখেছে।
দ্বিতীয়ত: পাঞ্জাবি নষ্ট করা হয়েছে —এটা চুরি নয়। বিয়ে ভেঙে দেওয়ার মতলব।
তৃতীয়ত: পাত্রীর বাবা শশাঙ্ক রায় এত দ্রুত এই ঘটনা জানলেন কীভাবে? ঘটনা ঘটেছে গত সন্ধ্যায়, সকালে ফোন করলেন তিনি। কে জানাল তাঁকে?
এটাই অদৃশ্য সূত্রই হয়তো — তথ্যের গতিপথ।
প্রমথেশ অনুপমের কাছে গেলেন। ছেলেটা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।
"অনুপম, তোমার বাবার আলমারির চাবি কার কাছে থাকে?"
"বাবার কাছে।"
"কপি আছে?"
একটু থামল অনুপম। "একটা কপি মায়ের কাছে।"
"আর?"
আবার থামল। "আমার কাছেও একটা আছে। জরুরি কাজে যদি লাগে।"
"সেটা কোথায়?"
"আমার ঘরে।"
"দেখাও।"
অনুপম গেল। কিছুক্ষণ পর ফিরে এল। মুখ ফ্যাকাশে।
"চাবিটা নেই।"
এক এক করে দুটো তালা খোলে একজন লোক সমস্ত ঘটনা ঘটালো, অথচ বাড়ির কেউ দেখলেন না কেমন অবাক লাগছে।
প্রমথেশ অনুপমের ঘর পরীক্ষা করলেন।
চাবি নেই। কিন্তু চাবি রাখার জায়গাটা — একটা পুরনো টিনের বাক্স — খোলা। ভেতরে ধুলোর দাগ বলছে চাবিটা এতদিন ধরে এখানেই ছিল।
প্রমথেশ পবিত্রের কথা মনে করলেন। অনুপমের বন্ধু। আধঘণ্টা ছিল।
কিন্তু আধঘণ্টায় অনুপমের ঘরে যাওয়া, চাবি চুরি করা, তারপর আলমারি খুলে পাঞ্জাবি বের করে নষ্ট করা — এতকিছু সম্ভব?
সম্ভব। যদি আগে থেকে পরিকল্পনা থাকে।
কিন্তু পবিত্রের মোটিভ কী?
প্রমথেশ জিজ্ঞেস করলেন অনুপমকে — "পবিত্রের সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন?"
অনুপম বলল, "ভালো। মানে... ভালোই ছিল।"
"ছিল?"
অনুপম একটু চুপ করে বলল, "পরীক্ষায় আমি ওর থেকে ভালো করেছিলাম। তারপর থেকে একটু দূরত্ব।"
"আর?"
দীর্ঘ বিরতি।
"ও... ও রিয়াকে পছন্দ করত।"
"রিয়া মানে তোমার হবু বউ?"
অনুপম মাথা নাড়ল।
প্রমথেশের কলম থামল।
পবিত্র চাবি চুরি করতে পারে। কিন্তু পবিত্র কি তালা পিকিং জানে? তাহলে চাবি চুরির দরকার কী?
দুটো পদ্ধতি একই অপরাধে ব্যবহার করা হয়নি।
হয় চাবি, নয় পিকিং।
তাহলে কি দুজন আছে?
দুপুরবেলা প্রমথেশ একটা কাজ করলেন যা তাঁর বিশেষত্ব।
তিনি পুলিশের পুরনো বন্ধু সুজিত চক্রবর্তীকে ফোন করলেন।
"সুজিত, আগরতলায় তালা পিকিং — কারা পারে?"
সুজিত বললেন, "পেশাদার হলে দুই-তিনটে গ্যাং আছে। কিন্তু শখের লোক? সে ইউটিউব দেখে শিখেছে।"
"ইউটিউব?"
"হ্যাঁ। আজকাল অনেকেই শেখে। লকস্মিথিং হবি হিসেবে।"
প্রমথেশ থামলেন। কলম ঘুরল দ্রুত।
শখ।
দীপক দেব — সুবলের ভাগিনেয়। চটপটে ছেলে, ব্যবসায়ী। আচরণে অতিরিক্ত শান্ত।
প্রমথেশ দীপকের ঘরে গেলেন। দীপক নেই — বাজারে গেছে বলেছিল।
ঘরে একটা ব্যাগ। সাধারণ কাপড়ের ব্যাগ।
প্রমথেশ ব্যাগ খুললেন না। শুধু বাইরে থেকে অনুভব করলেন।
শক্ত কিছু আছে ভেতরে।
একটু পরে দীপক ফিরল। প্রমথেশকে দেখে একটু চমকাল।
"কী খুঁজছেন?"
"কিছু না। তোমার ব্যাগটা নিজেই দেখাবে?"
দীপক একটু ইতস্তত করল। তারপর খুলল।
ভেতরে ছোট একটি মেটাল কিট — লকপিক সেট।
প্রমথেশ হাসলেন। "শখ?"
দীপক ঢোক গিলল। "শুধু... শুধু শখ। আমি কিছু করিনি।"
"আমি বলিনি তুমি করেছ," প্রমথেশ শান্তভাবে বললেন। "কিন্তু তোমার এই শখের কথা কে জানে?"
দীপক থামল।
তারপর বলল, "পবিত্র জানে।"
সব টুকরো জুড়তে শুরু করেছেন প্রমথেশ।
কিন্তু এখনো একটা প্রশ্নের উত্তর নেই।
কেন? পবিত্র হয়তো ঈর্ষান্বিত — রিয়াকে পছন্দ করত, পরীক্ষাতেও হেরেছে।জীবন সঙ্গিনীর অর্জনেও সে ব্যর্থতার মুখোমুখি। কিন্তু শুধু পাঞ্জাবি নষ্ট করলে বিয়ে ভাঙবে এটা সে কীভাবে জানল?
প্রমথেশ রঞ্জিতা সাহার কাছে গেলেন।
মহিলা চা বানাচ্ছিলেন। প্রমথেশকে দেখে হাসলেন।
"বসুন গোয়েন্দাবাবু।"
প্রমথেশ বসলেন। কলম বের করলেন।
"পাঞ্জাবিটার কথা আপনি শশাঙ্কবাবুকে জানিয়েছিলেন?"
রঞ্জিতার হাত একটু কাঁপল।
"আমি? না তো।"
"সন্ধ্যায় ঘটনা। সকালে শশাঙ্কবাবুর ফোন। গীতা দেবী জানাননি — তিনি তখন কাঁদছিলেন। সুবলবাবু তখন হতভম্ব। অনুপম ফোন করেনি, আমি দেখেছি। তাহলে কে জানাল?"
রঞ্জিতা চুপ।
"পাঞ্জাবির দিকে আপনি একবারও তাকাননি — কারণ আপনি জানতেন ওটা কেমন বীভৎস দেখাচ্ছে।"
দীর্ঘ নীরবতা।
তারপর রঞ্জিতা বললেন, ধীরে, "পবিত্র আমার ধর্মের ভাইপো।"
সব বেরিয়ে এল।
পবিত্র দাশগুপ্ত রঞ্জিতার ভাইপো — এটা কেউ জানত না, সে কখনো তাদের বাড়িতে আসার সুযোগ পায়নি ।
দিল্লিতে যাবার পূর্বে পবিত্র রিয়াকে পছন্দ করত। রিয়ার বাবা শশাঙ্ক একসময় পবিত্রকেই পাত্র হিসেবে ভেবেছিলেন, কিন্তু অনুপমের সরকারি চাকরির খবর পেয়ে মত পরিবর্তন করেন।
পবিত্রের ক্ষোভ ছিল — নিজের যোগ্যতা নিয়ে এবং রিয়ার বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে।
রঞ্জিতা পরিবারের কাছের মানুষ হওয়ার সুযোগে জেনেছিলেন পাঞ্জাবির গল্প — যে ঠাকুরদার দেওয়া পাঞ্জাবি পরে বিয়েতে না গেলে শশাঙ্ক মেয়ের বিয়ে দেবেন না, কারণ রিয়ার ঠাকুরদা নিজেই এই শর্ত দিয়ে ছিলেন একমাত্র নাতনি রিয়াকে।
পাঞ্জাবি নষ্ট করলে বিয়ে ভাঙবে। বিয়ে ভাঙলে পবিত্র হয়তো রিয়াকে ফিরে পাবে।
রঞ্জিতা ভেতর থেকে সাহায্য করেছেন — আলপনার নাম করে এসে অনুপমের ঘর থেকে চাবি সরিয়েছেন। পবিত্র সন্ধ্যায় এসে দীপকের লকপিক ব্যবহারের গল্প বলে নিজেকে সন্দেহের বাইরে রেখেছিল — কিন্তু আসলে চাবি দিয়েই কাজ করেছে। লকপিকের আঁচড়ের দাগ সে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করেছিল দীপককে ফাঁসাতে।
সাধারণ বন্ধু। আধঘণ্টার ভিজিট আর এতো বড়ো ঘটনা এখানে।
বিকেল চারটে।
প্রমথেশ সকলকে এক ঘরে ডাকলেন।
সুবল, গীতা, অনুপম, দীপক, রঞ্জিতা।
পবিত্রকে ফোন করে ডাকা হয়েছে।
প্রমথেশ বললেন, শান্তভাবে, "কাঁচি দিয়ে কাটা মানে সময় নিয়ে কাজ। টেনে ছেঁড়া মানে রাগ বা আবেগ। কিন্তু এই দুটো একসাথে মানে — পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু মনে একটা দ্বন্দ্বও ছিল।"
তিনি রঞ্জিতার দিকে তাকালেন।
"আপনি যখন পাঞ্জাবি কাটছিলেন, হাত একটু কেঁপেছিল। তাই কাঁচির কাট অসম। আর যখন টেনে ছিঁড়েছেন — সেটা রাগে নয়, তাড়াতাড়িতে।"
রঞ্জিতার মুখ সাদা।
প্রমথেশ পবিত্রের দিকে ফিরলেন।
"তুমি রিয়াকে ভালোবাসতে। সেটা অপরাধ নয়। কিন্তু তুমি ভুলে গিয়েছিলে — প্রেম পাওয়া যায় না ষড়যন্ত্র করে।"
পবিত্র মাথা নামিয়ে নিল।
রাত আটটায় শশাঙ্ক রায়কে জানানো হলো সব ঘটনা।
তিনি চুপ করে শুনলেন। তারপর বললেন, "কাল বিয়ে হবে।"
অনুপম নতুন লাল পাঞ্জাবি পরবে — বাজার থেকে আনা হবে আবার। ঠাকুরদার দেওয়া পাঞ্জাবি না থাকলেও তার আশীর্বাদ আবশ্যই নাতনির জন্য ঠাকবে।
প্রমথেশ বাইরে বেরিয়ে এলেন।
রাস্তায় আগরতলার সন্ধ্যা। দূরে মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে। শীতের হাওয়ায় ধূপের গন্ধ।
মিনতি ফোন করলেন — "কখন আসবে তুমি? কবে সেই সকালে বেড়িয়ে গেছ!"
"আসছি। কয়টা রসগোল্লা কিনেই আসছি।"
"আবার?"
"ভাবার কাজ শেষ। এখন খাওয়ার পালা।"
প্রমথেশ দাশ কলমটা পকেটে রাখলেন।
এবার মনে মনে ভাবছেন কাটা পাঞ্জাবিটা শুধু একটা সাক্ষী মাত্র। অপরাধ থাকে মানুষের বুকের ভেতরে, সেই জায়গায় যেখানে ভালোবাসা আর হতাশা পাশাপাশি বাস করে।
একটা পাঞ্জাবি ছিঁড়ে ফেলা যায়,কাটা যায়; কিন্তু ‘সত্য ‘— সেটা কাঁচি দিয়ে কাটা যায় না, ছিঁড়ে ফেলা যায় না কোন ভাবেই। তাই বুঝি বলা হয়, ‘সত্যমেব জয়তে’।

Post a Comment